নেপালকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ
ক্রীড়া প্রতিবেদক: নেপালের বিপক্ষে ম্যাচটিকে বাংলাদেশের জন্য এক অর্থে ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ বলাই যায়। সেমিফাইনালের এই কঠিন বৈতরণী পার হতে না পারলে অবসান ঘটত দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে বাংলাদেশের দীর্ঘ চার বছরের একচ্ছত্র আধিপত্যের। ম্যাচের শুরুতে ছন্নছাড়া ফুটবল খেলে পিছিয়ে পড়লেও, শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে নেপালকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা করে নিল লাল-সবুজের মেয়েরা।
আজ বুধবার (৩ জুন) ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালে নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমা এবং নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা স্ট্রাইকার মোসাম্মাৎ সাগরিকা।
নেপালের আক্রমণ ও শুরুতে গোল হজম:
ম্যাচের শুরু থেকেই নেপালের একের পর এক ধারালো আক্রমণে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। শুরুর দিকে রক্ষণভাগের কল্যাণে কয়েকবার বেঁচে গেলেও ম্যাচের ২৩তম মিনিটে আর শেষ রক্ষা হয়নি। কর্নার থেকে উড়ে আসা বল বাংলাদেশের ডি-বক্সের ভেতর জটলার সৃষ্টি করলে, সেখান থেকে সুযোগ বুঝে বল জালে জড়িয়ে দেন নেপালের ফুটবলার গীতা রানা। ১-০ তে পিছিয়ে পড়ে ব্যাকফুটে চলে যায় বাংলাদেশ।
পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে আরও একটি বড় বিপদ থেকে বেঁচে যায় দল। নেপালের ফরোয়ার্ড প্রীতি রাজের একটি দূরপাল্লার বুলেট গতির শট লাফিয়ে উঠে ফিঙ্গারটিপস দিয়ে কোনোমতে আটকে দেন বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তার; এরপর বলটি পোস্টে লেগে ফিরে আসলে নিশ্চিত গোল থেকে রক্ষা পায় দল।
ঋতুপর্ণার ম্যাজিক ও অলিম্পিক গোল:
পুরো প্রথমার্ধে মাঠের খেলায় ঋতুপর্ণা চাকমাকে সেভাবে খুঁজে পাওয়া না গেলেও, প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মিনিটে (৪৫ মিনিটে) বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি ও উল্লাস ফেরান তিনিই। কর্নার থেকে সরাসরি এক বাঁকানো শটে অবিশ্বাস্য এক ‘অলিম্পিক গোল’ করে বাংলাদেশকে ১-১ সমতায় ফেরান এই ফরোয়ার্ড। এই সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আবারও অল্পের জন্য বেঁচে যায় বাংলাদেশ। মিলি আক্তারকে ফাঁকি দিয়ে নেপালের এক স্ট্রাইকার ফাঁকা পোস্ট লক্ষ্য করে বল ঠেলে দিলেও, তা এবারও পোস্টে লেগে দিক পরিবর্তন করলে গোললাইন পার হয়নি। এরপর ম্যাচের মাঝের সময়ে দুই দলই বেশ কয়েকটি আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ চালালেও কেউই জালের দেখা পাচ্ছিল না।
শেষ মিনিটে সাগরিকার জয়সূচক গোল ও ১১৪ মিনিটের নাটকীয়তা:
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই নির্ধারিত ৯০ মিনিটের শেষ মিনিটে গোল করে ইতিহাস গড়েন সাগরিকা। ডি-বক্সের ভেতর ছয়গজ দূর থেকে সাগরিকাকে চমৎকার এক পাস বাড়িয়ে দেন শামসুন্নাহার জুনিয়র। নেপালি ডিফেন্ডারদের জটলার মধ্য থেকে ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান সাগরিকা। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই উন্মত্ত উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো বাংলাদেশ দল।
এরপর ইনজুরি টাইম হিসেবে ম্যাচে প্রথমে ৬ মিনিট যোগ করা হলেও, মাঠে উত্তেজনা ও ইনজুরির কারণে খেলা শেষ পর্যন্ত গড়ায় ১৪ মিনিটে! অর্থাৎ নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা গিয়ে থামে ১১৪ মিনিটে। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই ফাইনাল নিশ্চিতের আনন্দে মেতে ওঠে বাংলাদেশ।
তবে ম্যাচ জয়ের পর বাংলাদেশের সব খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ মাঠের এককোণে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন দলের সিনিয়র ডিফেন্ডার শিউলি আজিমকে। গতকালই (মঙ্গলবার) নিজের মাকে হারিয়েছেন শিউলি। মায়ের মৃত্যুর এই বিশাল শোক পাথরচাপা দিয়ে দেশের জন্য মাঠে নেমেছিলেন তিনি। রেফারি খেলা শেষের ঘোষণা দিতেই মা হারানো শিউলিকে ঘিরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং এই ঐতিহাসিক জয় তাকেই উৎসর্গ করেন সতীর্থরা।