এক দশকে প্রথমবার বিশ্বজুড়ে কমল বাস্তুচ্যুতদের সংখ্যা, তবে বিপদের আভাস

জুন ১১, ২০২৬ | Feature-2 |

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বা ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি-এর বরাতে জানা গেছে, গত বছরের (২০২৫) শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমে ১১ কোটি ৭৮ লাখে (প্রায় ১১৮ মিলিয়ন) দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ লাখ কম।

তবে বাস্তুচ্যুতির এই সংখ্যা কমে আসলেও একে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক বলতে নারাজ জাতিসংঘ। সংস্থাটি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে নিজ ভূমি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের এই সংখ্যাটি এখনও ‘অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় উচ্চ’। আগামী দশকের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির এই হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা কমার কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যাবর্তন:

জাতিসংঘের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো—বিপুলসংখ্যক শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের (IDP) নিজ নিজ দেশে বা আদি নিবাসে ফিরে যাওয়ার একটি তীব্র প্রবণতা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রেকর্ড ১ কোটি ৪৭ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের নিজ দেশে বা আগের আবাসে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে ৪৪ লাখ এমন শরণার্থী রয়েছেন, যারা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যা গত ৬০ বছরের ইতিহাসে শরণার্থী ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড।

চাপের মুখে বিপজ্জনক ফেরা: হুঁশিয়ারি জাতিসংঘের:

বাস্তুচ্যুতদের এই ফিরে যাওয়াকে এক চরম মানবিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক প্রধান বারহাম সালিহ। জেনেভায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “গত বছর ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের ‘৯০ শতাংশেরও বেশি’ মূলত আফগানিস্তান, সুদান এবং সিরিয়ার নাগরিক। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের অনেকের এই প্রত্যাবর্তন কোনো নিরাপদ বা স্থিতিশীল পরিবেশে ঘটেনি, বরং তারা চরম চাপের মুখে পড়ে নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।”

তিনি কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “তারা এমন সব দেশে ফিরে গেছেন যেখানে এখনও তীব্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে, যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মৌলিক পরিষেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অনিরাপদ এই প্রত্যাবর্তন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আরেকটি চক্রের জন্ম দেওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।”

ইউক্রেন ও সুদানের সংঘাতের ক্ষত:

বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষকে ‘শরণার্থী’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত এক বছরেই ৫৪ লাখের বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে নতুন করে শরণার্থী হয়েছেন। এই নতুন শরণার্থীদের ৬০ শতাংশই এসেছেন মাত্র আটটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে। এর মধ্যে যুদ্ধবিক্ষোভ সুদান থেকে প্রায় ১০ লাখ এবং ইউক্রেন থেকে প্রায় 8 লাখ মানুষ নতুন করে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

চলতি বছরের নতুন সংকট: ইরান ও লেবানন:

প্রতিবেদনে চলতি বছরের (২০২৬) শুরু থেকে গণ-বাস্তুচ্যুতির পেছনে থাকা বেশ কয়েকটি নতুন সামরিক সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কেবল ইরানের ভেতরেই ৩২ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে, লেবাননে গত মার্চ থেকে চলমান ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলার কারণে আরও ১০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। এই তীব্র সংঘাতের কারণে ইরান ও লেবানন-এ আশ্রয় নেওয়া অনেক শরণার্থীও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে পুনরায় সিরিয়া ও আফগানিস্তানের মতো অস্থির দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পুনর্বাসনের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় উদ্বেগ:

বাস্তুচ্যুতদের তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে স্থায়ী পুনর্বাসনের (Resettlement) সুযোগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ২৯ লাখ শরণার্থীর জরুরি পুনর্বাসন প্রয়োজন। অথচ যেখানে ২০২৪ সালে পুনর্বাসনের সুযোগ চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে (১ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০) পৌঁছেছিল, সেখানে গত বছর সেই সুযোগ অর্ধেকেরও বেশি কমে মাত্র ৮১ হাজার ৮০০-তে নেমে এসেছে। এর পেছনে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী প্রধান রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানবিক সহায়তা মূলত সাময়িক জরুরি পরিস্থিতির জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। লাখ লাখ মানুষকে এই পরনির্ভরশীলতা ও বাস্তুচ্যুতির অভিশাপ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে বিশ্বনেতাদের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে শামিল হতে হবে।



Leave a Comment