ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল ও স্বপ্নার জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। আজ রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে এই জেল আপিল দায়ের করেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার (আদালত নথিতে স্বপ্না রহমান/স্বপ্না খাতুন)।
আদালত সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর আইনানুযায়ী গত ৯ জুন আসামিদের মৃত্যুদণ্ড (ডেথ রেফারেন্স) অনুমোদনের মূল নথি হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য গৃহীত হওয়ায় এখন হাইকোর্টে এই মামলার চূড়ান্ত আইনি পরীক্ষা শুরু হবে।
মাত্র ২০ দিনে ঐতিহাসিক বিচার সম্পন্ন:
ঢাকার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের বিচারটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হওয়া একটি মামলা। গত ১৯ মে সকালে পল্লবীতে এই আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। ঘটনার পরদিন ২০ মে (১৯ মে দিবাগত রাত) ১২টা ৫ মিনিটে নিহত শিশুর বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে ভিকটিমকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা ও লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
মামলা দায়েরের পর দ্রুততম সময়ে তদন্তে মাঠে নামে পুলিশ। ঘটনার মাত্র ৪ দিনের মাথায় গত ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন, যাতে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়।
পরবর্তীতে গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। ২ জুন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ওই এক দিনেই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করার পর, ৪ জুন উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এরপর গত ৭ জুন ঘটনার মাত্র ২০ দিনের মাথায় আদালত আসামিদের ফাঁসির ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
কৌশলে ঘরে ডেকে নিয়ে বর্বরোচিত হত্যা:
মামলার এজাহারের ভয়াবহ বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হয় শিশু রামিসা আক্তার। এ সময় প্রতিবেশী সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না কৌশলে শিশুটিকে ডেকে নিজেদের বাসায় নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেলের দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান তিনি।
অনেক ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং পাশে একটি বড় বালতির মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান।
নৃশংস এই ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেওয়া হলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আসামিদের দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকরের দাবি উঠেছিল।