৪ দিন পর শূন্যরেখার সেই ১২ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ

June 15, 2026 | Feature-2 |

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: টানা চার দিন ধরে মাথার ওপর খোলা আকাশ আর চারপাশে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াকে সঙ্গী করে মানবেতর জীবনযাপনের পর অবশেষে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো-ম্যানস ল্যান্ড) অবস্থান করা সেই ১২ জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। আজ সোমবার (১৫ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে এক সফল ও ফলপ্রসূ পতাকা বৈঠকের পর ওই ১২ ভারতীয় নাগরিককে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তারা।

কুষ্টিয়ার ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আজ সোমবার সকালে সীমান্তের ১৫০ নম্বর মেইন পিলারের ৩-এস সাব-পিলারের কাছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এই বিশেষ পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা এবং বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ভারতের রানীনগর বিএসএফ ক্যাম্পের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডার সুনীল কুমার যাদব। বৈঠকে বিজিবির অনড় অবস্থান ও তথ্য-প্রমাণসহ ফলপ্রসূ আলোচনার পর শূন্যরেখায় চার দিন ধরে আটকে থাকা চারজন নারী, চারজন পুরুষ ও চারজন শিশুকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয় বিএসএফ। পরে যাবতীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিএসএফ সদস্যরা ওই ১২ জনকে নিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরে যান।

কৃষকদের প্রতিরোধ ও ৪ দিনের পুশইন নাটক:

সীমান্ত সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত শুক্রবার (১২ জুন) ভোরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চরবিলগাথুয়া সীমান্ত দিয়ে ওই ১২ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পুশইন (অনুপ্রবেশ) করার চেষ্টা করে বিএসএফ। ওই সময় স্থানীয় বাংলাদেশি বাসিন্দা ও মাঠে থাকা কৃষকেরা বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে খবর দেন এবং সবাই মিলে একজোট হয়ে তাদের পুশব্যাক (প্রতিরোধ) করেন।

বিএসএফের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশেও ঢুকতে পারেনি, আবার ভারতের অভ্যন্তরেও ফিরে যেতে পারেনি। ফলে দুই দেশের সীমানার মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় আটকা পড়ে তিনটি পরিবার। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির কারণে এদের অনেকেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে সীমান্ত আইন অমান্য করেই সম্পূর্ণ মানবিক কারণে স্থানীয় বাংলাদেশিরা কৌশলে কাঁটাতারের ওপার থেকে আটকে পড়াদের কাছে বিস্কুট, পাউরুটি, তরল দুধ, কলা, পানি ও তিন বেলার নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিয়ে আসছিলেন, যা সীমান্তে এক অনন্য মানবিকতার নজির সৃষ্টি করে।

আটকে পড়াদের পরিচয় ও বিজিবির সাফল্য:

শূন্যরেখায় আটকে থাকা অবস্থায় ওই ব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন, তারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে দিনমজুর ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিএসএফের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের পুশইন করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চার সদস্যের পরিবারের বাড়ি সাতক্ষীরা এবং তিন সদস্যের অপর পরিবারের বাড়ি খুলনায় বলে তারা দাবি করেছিলেন।

এর আগে গত শনিবার (১৩ জুন) এই ১২ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে আরও একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সে সময় বিএসএফ তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। অবশেষে বিজিবির অনড় অবস্থান, দৃঢ় মনোবল ও কৌশলী কূটনৈতিক তৎপরতায় আজ সোমবার তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার পর চরবিলগাথুয়া সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।



Leave a Comment