৪ আগস্ট ২০২৪: গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত অধ্যায়ের সূচনা

August 4, 2026 | Feature-2 |

বিশেষ প্রতিবেদন: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট—বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত এবং টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত এক দিন। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিনেই সারাদেশে নেমে আসে ভয়াবহ সহিংসতার ঢেউ। সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ছাত্র-জনতার ত্রিমুখী সংঘর্ষে দেশের অন্তত ২০টি জেলায় একদিনেই নিহত হন কমপক্ষে ৯৩ জন।

দিনটি অপেক্ষাকৃত শান্তভাবে শুরু হলেও দুপুরের পর থেকে চরম রূপ নেয়। চরম পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা পূর্বঘোষিত ৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পুনর্নির্ধারণ করেন, যা পরবর্তীতে দেশের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।

শাহবাগ ও ঢাকার রাজপথ: নাহিদ ইসলামের হুঁশিয়ারি ও শাহবাগে গুলি
৪ আগস্ট বিকেলে শাহবাগে লাখো ছাত্র-জনতার সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:

“আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক—বিজয় ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখনো সময় দিচ্ছি। সরকার যদি সহিংসতা চালিয়ে যেতে থাকে, আমরা জানিয়ে দিতে চাই, আমরা গণভবনের দিকে তাকিয়ে আছি। যেখানেই আঘাত আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। বিজয়ের আগ পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছাড়বেন না।”

এদিন বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে আন্দোলনে নিহতদের মরদেহ নিয়ে ঢামেক-টিএসসি-শাহবাগ রুটে এক বিশাল শোক ও বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছালে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়েছে—এমন অজুহাতে পুলিশ অতর্কিতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি-২৭, মহাখালী, রামপুরা, মিরপুর-১০ ও উত্তরায় হাজার হাজার অভিভাবক, শিক্ষক, দিনমজুর ও নানা পেশার মানুষ রাজপথে নেমে এলে সরকারদলীয় সশস্ত্র কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বাধে। মিরপুর-১০ ও শাহবাগে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) প্রাঙ্গণে অন্তত ২৪টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ঢাকার বাইরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার ও নিউ এজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট সারাদেশে অন্তত ৯৩ জন প্রাণ হারান। ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে:

লক্ষ্মীপুর ও ফেনী: প্রতি জেলায় ৮ জন করে মোট ১৬ জন নিহত।

সিরাজগঞ্জ (রায়গঞ্জ): সংঘর্ষে ৫ জন নিহত।

বগুড়া: ৫ জন নিহত।

রংপুর, মাগুরা ও সিলেট: প্রতি জেলায় ৪ জন করে নিহত।

পাবনা, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লা: প্রতি জেলায় ৩ জন করে নিহত।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাজধানীসহ দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করা হয়, ফোর-জি ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরদিন থেকে ৩ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।

নাগরিক সমাজ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব
৪ আগস্ট সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে বলা হয়:

শেখ হাসিনা সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

ছাত্র-জনতার সম্মতিক্রমে শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে।

অন্যদিকে, একই দিনে আন্দোলনকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো বন্ধের দাবিতে দায়ের করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। আদালত মন্তব্য করেন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার তাগিদে প্রয়োজনবোধে পুলিশ বলপ্রয়োগ করতে পারে।

একই সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যায্য ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অহিংস আন্দোলনকে জোর করে রক্তাক্ত করার জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানায়।



Leave a Comment